শনিবার । ২রা মে, ২০২৬ । ১৯শে বৈশাখ, ১৪৩৩

গণভোটের রায় অস্বীকার করে দেশকে সংকটে ঠেলে দিচ্ছে সরকার : গোলাম পরওয়ার

নিজস্ব প্রতিবেদক

গণভোটে জনগণের প্রত্যক্ষ রায়কে পাশ কাটিয়ে সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে দেশকে এক গভীর রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, এমন অভিযোগ তুলেছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, জুলাই সনদের আড়ালে গণভোটের রায়কে অস্বীকার করা হচ্ছে। এটি কেবল রাজনৈতিক কৌশল নয়, সরাসরি জনগণের ম্যান্ডেটের বিরুদ্ধে অবস্থান।

শনিবার (২ মে) দুপুরে খুলনা প্রেসক্লাবের ব্যাংকুয়েট হলে খুলনা মহানগরী জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত ‘গণভোটের রায়ের বিরুদ্ধে সরকার : সংকটের মুখোমুখি দেশ’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন।

মিয়া গোলাম পরওয়ার আরও অভিযোগ করেন, সরকার সচেতনভাবেই জুলাই সনদ এবং গণভোটের রায় এই দুই বিষয়কে আলাদা করে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করছে। তার দাবি, সরকার ও মন্ত্রীরা সংসদে দাঁড়িয়ে বারবার জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিলেও গণভোটে জনগণের দেওয়া সরাসরি রায়ের বিষয়ে নীরবতা বজায় রাখছে।

তিনি বলেন, একবারও কোনো মন্ত্রী বলেননি, গণভোটের রায় অক্ষরে অক্ষরে মানা হবে। কারণ তারা জানে, সেটি মানলে তাদের রাজনৈতিক হিসাব ভেঙে পড়বে।

জামায়াতের এই সেক্রেটারি জেনারেল প্রশ্ন তোলেন, গণভোটের আগে দীর্ঘ চার মাস সময় থাকা সত্ত্বেও সরকার বা সংশ্লিষ্টরা কেন কোনো আপত্তি তোলেননি। ১৭ অক্টোবর জুলাই সনদে স্বাক্ষর, ১৩ নভেম্বর রাষ্ট্রপতির আদেশ, ২৫ নভেম্বর গণভোটের অধ্যাদেশ, ফেব্রুয়ারিতে ভোট এই পুরো সময়জুড়ে কেউ বলেননি এসব অসাংবিধানিক। অথচ ক্ষমতায় বসেই সবকিছু অবৈধ বলা হচ্ছে। এটি সুস্পষ্ট দ্বিচারিতা।

সংবিধান সংস্কারের ৮৪টি প্রস্তাবের মধ্যে ৪৭টি আইনি ও সাংবিধানিক সংস্কারের কথা উল্লেখ করে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, এসব বিষয়ে ঐকমত্য থাকলেও ১০টি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে বিএনপি নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে, যা বাস্তবে সংস্কারের মূল কাঠামোকেই দুর্বল করে দেয়।

তিনি আরও বলেন, যেসব বিষয়ে বিএনপি আপত্তি তুলেছে, প্রধানমন্ত্রী একইসঙ্গে দলপ্রধান থাকতে পারবেন না, উচ্চকক্ষে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতি মানতে অস্বীকৃতি, আন্তর্জাতিক চুক্তি সংসদে উপস্থাপন ও অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা না মানা, বিচারপতি নিয়োগে স্বাধীন কমিশনের বিরোধিতা, পাবলিক সার্ভিস কমিশন ও দুর্নীতি দমন কমিশনে প্রধানমন্ত্রীর প্রভাব কমানোর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান।

তিনি বলেন, এই ১০টি জায়গা বাদ দিলে পুরো সংস্কারই অর্থহীন হয়ে যায়। সরকার আসলে এখানেই নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে চায়। গণভোটে প্রায় পাঁচ কোটি মানুষের সরাসরি অংশগ্রহণে যে রায় এসেছে, সেটি সংসদের ডেলিগেটেড ক্ষমতার চেয়েও শক্তিশালী। সংসদ সদস্যরা জনগণের প্রতিনিধি, তারা ডেলিগেটেড পাওয়ার এক্সারসাইজ করেন। কিন্তু গণভোটে জনগণ সরাসরি সিদ্ধান্ত দেয়। সেই সিদ্ধান্ত অস্বীকার করা মানে জনগণের সার্বভৌমত্ব অস্বীকার করা।

সংবিধানের ৭ নভেম্বর অনুচ্ছেদ উল্লেখ করে তিনি বলেন, জনগণের ইচ্ছাই সর্বোচ্চ আইন। পার্লামেন্ট কখনোই সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী নয়। সরকারের বর্তমান অবস্থানকে তিনি কর্তৃত্ববাদী ও ফ্যাসিবাদী প্রবণতা হিসেবে উল্লেখ করেন। তার বক্তব্য, সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে জনগণের রায়কে অস্বীকার করা হচ্ছে। এটি গণতন্ত্র নয়, ফ্যাসিবাদের লক্ষণ। এই ধারা অব্যাহত থাকলে দেশে আবারও সংঘাত, অস্থিরতা ও রক্তপাতের পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।

সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, পার্লামেন্টে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না হলে আন্দোলনের পথেই যেতে বাধ্য হবে সংশ্লিষ্টরা। পাঁচ কোটি মানুষ যে রায় দিয়েছে, তা যদি সংসদে বাস্তবায়ন না হয়, আমরা আবার জনগণের কাছে ফিরে যাব। আন্দোলনই তখন একমাত্র পথ। তিনি সরকারকে সংসদে ফিরে গণভোটের রায় বাস্তবায়নের আহ্বান জানান।

সতর্ক করে দিয়ে তিনি বলেন, সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। এখনো সুযোগ আছে, সংকট এড়াতে হলে জনগণের ম্যান্ডেটকে সম্মান করতে হবে। অন্যথায় এর দায় সরকারকেই নিতে হবে।

জামায়াতে ইসলামীর খুলনা মহানগরী আমির মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমানের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি ছিলেন খুলনা অঞ্চল টিম সদস্য মাওলানা আবুল কালাম আজাদ এমপি, বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি মাস্টার শফিকুল আলম, জামায়াতে ইসলামীর জেলা আমির মাওলানা এমরান হুসাইন। ‘গণভোটের রায়ের বিরুদ্ধে সরকার : সংকটের মুখোমুখি দেশ’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ল’ ইয়ার্স কাউন্সিলের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ শাহা আলম।

মহানগরী জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি প্রিন্সিপাল শেখ জাহাঙ্গীর আলমের পরিচালনায় প্রবন্ধের উপর আলোচনা করেন ও উপস্থিত ছিলেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপসচিব শ ম আবু তালিব, খুলনার সরকারি মজিদ মেমোরিয়াল সিটি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর শামসুজ্জামান, অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুর রহমান, এনসিপির খুলনা মহানগরীর প্রধান সমন্বয়ক আহম্মদ হামীম রাহাত, খুলনা মহানগরী খেলাফত মজলিসের সভাপতি এফ এস হারুন অর রশীদ, সাংগঠনিক সম্পাদক এইচ এম সাজ্জাদ হোসেন চঞ্চল, ইসলামী ছাত্রশিবির খুলনা মহানগর সভাপতি রাকিব হাসান প্রমুখ।

খুলনা গেজেট/এএজে




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন